
ডেক্স নিউজ : সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ৪নং লেঙ্গুড়া ইউনিয়নের নিয়াগুল এলাকায় দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ ও পরকীয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তালাক, মামলা-পাল্টা মামলা এবং বসতবাড়ি দখলের চেষ্টাকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় আদালত ওই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছেন। এ ঘটনায় রোকিয়া বেগম (৬৫) নামে এক বৃদ্ধা নারী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০-১১ বছর আগে নিয়াগুল এলাকার রোকিয়া বেগমের ছেলে সৌদি প্রবাসী এবাদুর রহমানের সঙ্গে একই এলাকার রাজিনা বেগমের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে দুই কন্যা ও এক পুত্রসন্তান রয়েছে। তবে বিয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে পারিবারিক অশান্তি লেগেই ছিল।
বাদীপক্ষের দাবি, একপর্যায়ে রাজিনা বেগমের সঙ্গে স্থানীয় যুবক বদরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে দাম্পত্য কলহ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এ নিয়ে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে শাশুড়ি রোকিয়া বেগম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরকীয়ার বিষয়টি জানতে পেরে সৌদি প্রবাসী এবাদুর রহমান বিদেশ থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাজিনা বেগমকে ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে তালাক প্রদান করেন। এর পর থেকেই উভয় পরিবারের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে।
রোকিয়া বেগমের অভিযোগ, তালাকের পর বিবাদীপক্ষ সংঘবদ্ধ হয়ে তার বসতবাড়ির মালামাল, আসবাবপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া ধারালো অস্ত্র নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
গত ২৩ মে ২০২৬ সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রোকিয়া বেগমের বসতবাড়িতে নতুন করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা এবং কিছু ভিডিও ফুটেজে বিবাদীপক্ষকে মালামাল নিয়ে যেতে দেখা গেছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া সর্বসাধারণের পানীয় জলের জন্য সরকারি অর্থায়নে স্থাপিত একটি টিউবওয়েল রাজিনা বেগম খুলে নিয়ে যেতে দেখা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, টিউবওয়েলটি এলাকার সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য স্থাপন করা হয়েছিল।
চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে রোকিয়া বেগম অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৪৪ ধারায় আবেদন করেন। আদালত পরিস্থিতি বিবেচনা করে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ওই এলাকায় স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে ১৪৪ ধারা জারি করেন এবং গোয়াইনঘাট থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে, রাজিনা বেগমও শাশুড়ি ও বাদীপক্ষের বিরুদ্ধে পাল্টা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১০৭/১১৭(সি) ধারায় মামলা দায়েরের পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন। তবে আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে রাজিনা বেগমের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে রোকিয়া বেগম ও প্রবাসী এবাদুর রহমানকে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
রোকিয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, ৬ জুন ২০২৬ সকাল ১১টার দিকে রাজিনা বেগম তার আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রসহ তার বসতবাড়িতে হামলা চালান। এ সময় হামলাকারীরা ঘরের দরজা ও তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং হামলা চালায়।
তিনি আরও বলেন, খবর পেয়ে তার আত্মীয়রা গোয়াইনঘাট থানাকে বিষয়টি অবহিত করলে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠান। পুলিশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে দুটি কক্ষ তালাবদ্ধ করে রাখা হয় এবং উভয় পক্ষকে কোনো ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য স্থানীয় সংবাদকর্মীরা রাজিনা বেগমের বাবার বাড়িতে গেলে রাজিনা বেগম, তার ভাই এবং তার বাবা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ সময় তারা সংবাদকর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে সংবাদকর্মীরা কোনো বক্তব্য সংগ্রহ না করেই সেখান থেকে চলে আসেন।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় পুলিশি নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জোর দাবি জানিয়েছেন।